ডায়রিয়া কেন হয়? ডায়রিয়ার কারণ, লক্ষণ ও দ্রুত সেরে ওঠার উপায়
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল বা পেটের সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও সাধারণ একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়রিয়া। হঠাৎ করে দিনে তিন বা তার বেশি বার পাতলা পায়খানা হওয়া, পেট মোচড়ানো এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়াই ডায়রিয়ার প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে সচেতন না হলে বা শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে গেলে ডায়রিয়া বিপজ্জনক আকার ধারণ করতে পারে।
আজকের এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করব ডায়রিয়া কেন হয়, এর পেছনে প্রধান কারণগুলো কী কী এবং ডায়রিয়া হলে ঘরে বসে কীভাবে দ্রুত সুস্থ হবেন।
ডায়রিয়া হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
ডায়রিয়া সাধারণত কোনো একক কারণে হয় না। পেটে ক্ষতিকর অনুজীবের প্রবেশ বা হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটলেই মূলত এই সমস্যা দেখা দেয়। নিচে ডায়রিয়ার প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণ
আমাদের দেশে ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জীবাণুযুক্ত পানি বা বাসি-পচা খাবার খাওয়া। রাস্তায় বিক্রি হওয়া খোলা খাবার, মাছি বসা মিষ্টি বা খাবার এবং ঠিকমতো না ফুটিয়ে পানি পান করলে অন্ত্রে ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশ করে ডায়রিয়া ঘটায়।
২. ভাইরাল ইনফেকশন (Viral Infections)
বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে ডায়রিয়া হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রোটাভাইরাস (Rotavirus)। শিশুদের ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার জন্য এই ভাইরাসটি সবচেয়ে বেশি দায়ী। এছাড়া নো রোভাইরাস (Norovirus) ও এডেনোভাইরাসও প্রাপ্তবয়স্কদের পেটের সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
৩. ব্যাকটেরিয়া ও প্যারাসাইটের আক্রমণ
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা কাঁচা/আধাসেদ্ধ খাবার খেলে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (যেমন: E. coli, Salmonella, Shigella, Campylobacter) এবং এককোষী প্যারাসাইট (যেমন: Giardia lamblia) পেটে প্রবেশ করে বিষাক্ত পদার্থ নির্গমন করে, যা তীব্র ডায়রিয়া ও বমির সৃষ্টি করে।
৪. হাত পরিষ্কার না রাখা (অপরিচ্ছন্নতা)
খাবার খাওয়ার আগে বা শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত না ধোয়ার অভ্যাসের কারণে হাতের মাধ্যমে খুব সহজেই জীবাণু পেটে চলে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হাত মুখে দেওয়ার অভ্যাসের কারণে ডায়রিয়া বেশি দেখা যায়।
৫. অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অন্য কোনো রোগের জন্য কড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তা পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি অনেক সময় উপকারী ব্যাকটেরিয়াকেও (Good Bacteria) ধ্বংস করে ফেলে। ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পাতলা পায়খানা শুরু হতে পারে।
৬. ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স ও ফুড অ্যালার্জি
অনেকের শরীর দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার (যেমন ছানা, চিজ) সহজে হজম করতে পারে না, একে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বলে। আবার কিছু নির্দিষ্ট খাবারে অনেকের অ্যালার্জি থাকে। এসব খাবার গ্রহণের ফলেও সাময়িক ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।
ডায়রিয়া হলে ঘরে বসে প্রাথমিক করণীয়
ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট (লবণ) বের হয়ে যায়। তাই মূল লক্ষ্য হতে হবে পানি শূন্যতা পূরণ করা:
- খাওয়ার স্যালাইন (ORS): পাতলা পায়খানা শুরু হলেই প্রতিবার পায়খানার পর নিয়ম মেনে সঠিকভাবে তৈরি করা খাওয়ার স্যালাইন পান করতে হবে।
- প্রচুর তরল খাবার: স্যালাইনের পাশাপাশি ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, স্যুপ বা পরিষ্কার ফুটানো পানি প্রচুর পরিমাণে পান করতে হবে।
- সহজপাচ্য খাবার: নরম ভাত, জাও ভাত, কাঁচা কলা সেদ্ধ বা দই খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার বা মিষ্টি একদম বর্জন করুন।
- শিশুদের বুকের দুধ বন্ধ না করা: শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে কোনো অবস্থাতেই বুকের দুধ দেওয়া বন্ধ করা যাবে না।
কখন দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ ডায়রিয়া ২-৩ দিনের মধ্যে ঘরে বসেই সেরে যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত:
- রোগীর চোখ গর্তে ঢুকে যাওয়া, মুখ ও জিহ্বা অতিরিক্ত শুকিয়ে যাওয়া বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া (পানিশূন্যতার চিহ্ন)।
- মল বা পায়খানার সাথে রক্ত বা অতিরিক্ত মিউকাস/আম যাওয়া।
- একটানা তীব্র পেট ব্যথা ও সাথে উচ্চ মাত্রায় জ্বর থাকা।
- কিছু খেলেই অবিরত বমি হওয়া এবং স্যালাইন পেটে না থাকা।
প্রতিরোধেই মিলবে সমাধান
ডায়রিয়া থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সচেতনতা। সবসময় পরিষ্কার ও ফুটানো পানি পান করা, বাইরের খোলা বা বাসি খাবার এড়িয়ে চলা এবং খাওয়ার আগে হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে ডায়রিয়া থেকে দূরে থাকা একদম সহজ। একটু সতর্কতাই পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে এই কষ্টদায়ক রোগ থেকে মুক্ত রাখতে!