সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কেন হয়? কারণ ও সহজ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
দিনের বেলা হঠাৎ করে চারদিক অন্ধকার হয়ে যাওয়া কিংবা পূর্ণিমার চাঁদে কালো ছায়া পড়ার ঘটনাগুলো ছোটবেলা থেকেই আমাদের মনে এক অদ্ভুত কৌতুহল জাগায়। প্রাচীনকালে মানুষ এসব ঘটনাকে কোনো অশুভ শক্তির বা দানবের কারসাজি বলে ভয় পেত। কিন্তু বর্তমান আধুনিক যুগে আমরা জানি যে, এর পেছনে কোনো রহস্য বা জাদু নেই, পুরোটাই মহাকাশের নিখুঁত এক জ্যামিতিক খেলা।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ও সাবলীল ভাষায় জানবো সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ আসলে কেন হয় এবং এই মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর পেছনের আসল বিজ্ঞানটি কী।
মহাজাগতিক এই খেলার মূল কুশীলব কারা?
গ্রহণ বোঝার আগে আমাদের মহাকাশের তিনটি প্রধান সদস্যের অবস্থান পরিষ্কার থাকা দরকার—
- সূর্য: আমাদের সৌরজগতের শক্তির উৎস, যা নিজেই আলো দেয়।
- পৃথিবী: যে গ্রহটিতে আমরা বাস করি এবং যা সূর্যের চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলেছে।
- চাঁদ: পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ, যা পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে।
এই তিনটে বস্তু যখন মহাশূন্যে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক একটি সরলরেখায় চলে আসে, তখনই মূলত গ্রহণ নামক ঘটনাটি ঘটে।
সূর্যগ্রহণ কেন হয় (What is a Solar Eclipse)?
পৃথিবী যেমন সূর্যের চারদিকে ঘুরে, চাঁদ তেমনি পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে। ঘুরতে ঘুরতে কোনো এক অমাবস্যার দিনে যখন চাঁদ হুবহু সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝখানে চলে আসে, তখন সূর্যের আলো আর সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না। চাঁদের পিঠের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ে যায়। পৃথিবীর যে নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের ওপর চাঁদের এই ছায়া পড়ে, সেখান থেকে সূর্যকে সাময়িকভাবে ঢাকা বা অন্ধকার দেখা যায়। একেই সূর্যগ্রহণ বলে।
সূর্যগ্রহণের কিছু মজার তথ্য:
- সূর্যগ্রহণ সবসময় শুধুমাত্র অমাবস্যার দিনেই হয়ে থাকে।
- চাঁদ আকারে ছোট হলেও পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব এমন এক নিখুঁত মাপে যে এটি আমাদের দিক থেকে সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে।
- পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় দিনের বেলাতেই রাতের মতো অন্ধকার নেমে আসে এবং আকাশে তারা দেখা যায়।
- খালি চোখে কখনোই সরাসরি সূর্যগ্রহণ দেখতে নেই, এতে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে; এর জন্য বিশেষ সোলার ফিল্টার বা চশমা ব্যবহার করতে হয়।
চন্দ্রগ্রহণ কেন হয় (What is a Lunar Eclipse)?
চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, সে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে আমাদের আলো দেয়। এবার ঠিক উল্টো ঘটনাটি কল্পনা করুন—পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে যখন ঠিক সূর্য এবং চাঁদের মাঝখানে চলে আসে, তখন সূর্যের আলো সরাসরি চাঁদের গায়ে পড়তে বাধা পায়। ফলে পৃথিবীর বিশাল ছায়া গিয়ে পড়ে চাঁদের ওপর। পৃথিবীর আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়ে যাওয়ার এই ঘটনাকেই চন্দ্রগ্রহণ বলা হয়।
চন্দ্রগ্রহণের কিছু মজার তথ্য:
- চন্দ্রগ্রহণ সবসময় শুধুমাত্র পূর্ণিমার রাতেই ঘটে থাকে।
- সূর্যগ্রহণের মতো চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য কোনো চোখের সুরক্ষার প্রয়োজন হয় না, এটি খালি চোখেই সম্পূর্ণ নিরাপদে দেখা যায়।
- গ্রহণের সময় চাঁদ পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না, বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রতিসরণের কারণে চাঁদকে অনেক সময় কিছুটা তামাটে বা লালচে রঙের (Blood Moon) দেখায়।
- চন্দ্রগ্রহণ সাধারণত কয়েক ঘণ্টা ধরে স্থায়ী হয় এবং পৃথিবীর যেকোনো গোলার্ধের অনেক জায়গা থেকে একসাথে দেখা যায়।
প্রতি অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় কেন গ্রহণ হয় না?
আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—প্রতি মাসেই তো অমাবস্যা ও পূর্ণিমা আসে, তবে প্রতি মাসে কেন গ্রহণ লাগে না?
এর কারণ হলো, চাঁদ তার কক্ষপথে পৃথিবীর সাপেক্ষে ঠিক সোজা সমান্তরালে ঘোরে না, বরং সামান্য ৫ ডিগ্রি কোণ হেলে বা বাঁকা হয়ে ঘোরে। এই সামান্য হেলান থাকার কারণে বেশিরভাগ অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একদম নিখুঁত সরলরেখায় আসে না। চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর দিয়ে ওপর দিয়ে বা নিচ দিয়ে পার হয়ে যায়। কেবল বছরে নির্দিষ্ট কিছু সময়েই এরা নিখুঁত সরলরেখায় আসতে পারে, তখনই কেবল গ্রহণ দেখা যায়।
মহাকাশের এই সুশৃঙ্খল ও নিখুঁত ব্যবস্থার কারণেই বছরের পর বছর ধরে আমরা এই চমৎকার গ্রহণগুলো নিরাপদে দেখতে পেয়েছি। বিজ্ঞান আমাদের মনের কুসংস্কার দূর করে এই মহাজাগতিক রূপকে আরও সুন্দরভাবে উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।