কোষ কাকে বলে? জীবকোষের গঠন, প্রকারভেদ ও কাজ (বিস্তারিত গাইড)
পৃথিবীর সব জীবই—তা সুবিশাল তিমি মাছ হোক কিংবা অতিক্ষুদ্র কোনো অণুজীব—ছোট ছোট কিছু মৌলিক একক দিয়ে তৈরি। বিল্ডিং তৈরির জন্য যেমন ইটকে মূল একক ধরা হয়, ঠিক তেমনই সব ধরনের জীবদেহ গঠনের মূল একক হলো "কোষ" (Cell)। বায়োলজির মূল ভিত্তি বুঝতে হলে কোষ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
আজকের এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় জানবো কোষ কাকে বলে, এটি কীভাবে আবিষ্কার হলো, জীবকোষের প্রকারভেদ এবং এর মূল কাজগুলো কী কী।
কোষ কাকে বলে? (What is a Cell?)
সহজ কথায়, জীবদেহের গঠন ও কার্যকারিতার মৌলিক একককে কোষ বলে। অর্থাৎ, যে ক্ষুদ্রতম জৈবিক একক স্বাধীনভাবে জীবন ধারণ করতে পারে এবং নিজের প্রতিরূপ (Copy) তৈরি করতে পারে, তাকেই জীবকোষ বলা হয়।
বিজ্ঞানী লোই (Loewy) এবং সিকেভিজ (Siekevitz)-এর মতে: "কোষ হলো জৈবিক ক্রিয়াকলাপের একক যা একটি অর্ধভেদ্য ঝিল্লি (Semi-permeable membrane) দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং যা অন্য কোনো জীবন্ত মাধ্যম ছাড়াই নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম।"
কোষের আবিষ্কার (Discovery of Cell)
১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) প্রথম অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কাঠের কর্কের পাতলা ছেদ পরীক্ষা করে মৌমাছির চাকের মতো ছোট ছোট কুঠুরি বা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান। তিনি এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠগুলোর নাম দেন "Cell" (ল্যাটিন শব্দ Cellula থেকে এসেছে, যার অর্থ ছোট ঘর)। তবে রবার্ট হুক যেগুলো দেখেছিলেন, সেগুলো ছিল মূলত মৃত কোষের প্রাচীর। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী অ্যান্থনি ভন লিউয়েনহুক প্রথম জীবিত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন।
কোষের প্রধান প্রকারভেদ
গঠন ও নিউক্লিয়াসের পরিপক্কতার ওপর ভিত্তি করে কোষকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. আদিকোষ (Prokaryotic Cell)
যেসব কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না, অর্থাৎ নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাস অনুপস্থিত থাকে, সেগুলোকে আদিকোষ বলে। এদের সাইটোপ্লাজমে সুসংগঠিত কোনো অঙ্গাণু (যেমন: মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বডি) থাকে না।
- উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ সবুজ শৈবাল)।
২. প্রকৃতকোষ (Eukaryotic Cell)
যেসব কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে (নিউক্লিয়ার মেমব্রেন দ্বারা আবৃত) এবং সাইটোপ্লাজমে আবরণীবেষ্টিত অঙ্গাণুসমূহ উপস্থিত থাকে, সেগুলোকে প্রকৃতকোষ বলে।
- উদাহরণ: উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক ও অধিকাংশ শৈবালের কোষ।
কাজ অনুসারে প্রকৃতকোষ আবার দুই প্রকার:
- দেহকোষ (Somatic Cell): যা জীবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন করে (যেমন: ত্বকের কোষ, পেশিকোষ)।
- জননকোষ (Germ Cell): যা প্রজননে অংশ নেয় (যেমন: শুক্রাণু ও ডিম্বাণু)।
একটি আদর্শ কোষের প্রধান প্রধান উপাদান
একটি সুগঠিত প্রকৃতকোষ প্রধানত নিচের অংশগুলো নিয়ে গঠিত:
- কোষ প্রাচীর (Cell Wall): এটি শুধুমাত্র উদ্ভিদকোষে থাকে। শক্ত ও মৃত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি এই প্রাচীর কোষকে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়।
- কোষঝিল্লি (Plasma Membrane): প্রতিটি কোষের বাইরে যে স্থিতিস্থাপক সজীব পর্দা থাকে, তা কোষের তরল অংশকে রক্ষা করে ও পুষ্টি আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে।
- সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm): কোষঝিল্লির ভেতরে নিউক্লিয়াস বাদে বাকি তরল ও দানাদার অংশ, যেখানে বিভিন্ন কোষীয় অঙ্গাণু ভেসে থাকে।
- নিউক্লিয়াস (Nucleus): একে কোষের "মস্তিষ্ক" বলা হয়। এটি কোষের সব ধরনের জৈবিক কাজ ও বংশগতির বৈশিষ্ট্য (DNA/RNA) নিয়ন্ত্রণ করে।
- মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria): এটি কোষের শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বা "Power House" নামে পরিচিত, যা খাদ্য জারিত করে শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে।
- প্লাস্টিড (Plastid): প্রধানত উদ্ভিদকোষে থাকে। ক্রোমোপ্লাস্ট ও ক্লোরোপ্লাস্ট উদ্ভিদকে রঙিন করে এবং সালোকসংশ্লেষণে সহায়তা করে।
উদ্ভিদকোষ ও প্রাণীকোষের প্রধান পার্থক্য
যদিও উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ই প্রকৃতকোষ দিয়ে গঠিত, তবে এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
- কোষ প্রাচীর: উদ্ভিদকোষে শক্ত সেলুলোজ নির্মিত কোষ প্রাচীর থাকে, কিন্তু প্রাণীকোষে এটি অনুপস্থিত।
- প্লাস্টিড: উদ্ভিদকোষে ক্লোরোপ্লাস্ট (প্লাস্টিড) থাকে যা খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে; প্রাণীকোষে কোনো প্লাস্টিড থাকে না।
- কোষ গহ্বর (Vacuole): উদ্ভিদকোষে কোষ গহ্বর বিশাল আকারের এবং কেন্দ্রের দিকে থাকে, অন্যদিকে প্রাণীকোষে এটি সাধারণত থাকে না বা থাকলেও খুব ছোট হয়।
- সেন্ট্রোসোম: প্রাণীকোষে সেন্ট্রোসোম বা সেন্ট্রিওল থাকে (যা কোষ বিভাজনে সাহায্য করে), কিন্তু উন্নত উদ্ভিদকোষে এটি থাকে না।
জীবদেহে কোষের গুরুত্ব
১. জীবন রক্ষা: শ্বসন, রেচন, প্রোটিন সংশ্লেষণ ও শক্তি উৎপাদনের মতো অত্যাবশ্যকীয় সব শারীরবৃত্তীয় কাজ কোষের ভেতরেই সম্পন্ন হয়।
২. দেহের বৃদ্ধি: কোষ বিভাজনের (Mitosis) মাধ্যমেই একটি একপদী ভ্রূণ থেকে পূর্ণাঙ্গ জীবদেহের বিকাশ ঘটে।
৩. বংশগতি রক্ষা: কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা ক্রোমোজোম ও ডিএনএ মাতা-পিতার বৈশিষ্ট্য সন্তানদের মধ্যে বহন করে নিয়ে যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জীববিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় কোষের জ্ঞান অপরিহার্য। জীবনের ক্ষুদ্রতম এই এককটি না থাকলে পৃথিবীতে জীবজগতের অস্তিত্ব চিন্তা করাও অসম্ভব হতো। আশা করি এই পোস্টটি থেকে কোষ কাকে বলে এবং এর সার্বিক গঠন সম্পর্কে আপনারা একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন।